বিলুপ্তির পথে ‘বাংলা শকুন’
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৫-০৬-২০২৬ ০২:১৭:২৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৫-০৬-২০২৬ ০২:১৭:২৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
এক সময়ে বাংলাদেশের আকাশে সর্বত্রই ডানা মেলতে দেখা মিলতো প্রকৃতির ঝাড়ুদার খ্যাত ‘বাংলা শকুন’-এর। তবে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন আর বিষাক্ত ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারে এই উপকারী পাখিটি এখন দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত। বর্তমানে কেবল মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শকুনের দেখা পাওয়া যায়। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোটের (আইইউসিএন) রেড লিস্ট বা লাল তালিকায় ‘মহাবিপন্ন’ হিসেবে স্থান পাওয়া এই পাখির অস্তিত্ব বাংলাদেশে এখন চরম সংকটে।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে ১৮ প্রজাতির শকুনের মধ্যে বাংলাদেশে ছয় প্রজাতির শকুনের উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে ‘বাংলা শকুন’কেই অন্যতম ও প্রধান মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে এই বাংলা শকুন আজ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
যেসব কারণে বিলুপ্তির পথে বাংলা শকুন
তিন দশকের আগেও দেশের উঁচু উঁচু গাছগাছালিতে ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন বাস করতো। কোথাও কোনও গবাদিপশু মারা গেলে মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে শকুনের দল হাজির হতো। শকুনই একমাত্র পাখি, যেটি সতেজ থাকাকালেই মৃত পশুর শক্ত চামড়া ছিদ্র করে মাংস খেতে পারে। মৃত পশুকে দ্রুত সাবাড় করে ফেলায় পরিবেশ প্রাকৃতিকভাবেই দুর্গন্ধ ও দূষণমুক্ত হতো। এমনকি অ্যানথ্রাক্সসহ গবাদিপশুর বিভিন্ন মারাত্মক রোগজীবাণু অনায়াসে হজম করার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে শকুনের পাকস্থলীতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে মূলত দুটি প্রধান কারণে শকুনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে—
১. গবাদিপশুর চিকিৎসায় ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার: গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডাইক্লোফেনাক’, ‘কেটোপ্রোফেন’ বা অতিমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক শকুনের যম। এসব ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা অসুস্থ পশু মারা যাওয়ার পর তার মরদেহ যখন খোলা স্থানে ফেলে দেওয়া হয়, তখন শকুন এসে সেই মাংস খায়। পশুর দেহে থেকে যাওয়া এই ওষুধের বিষাক্ত প্রভাবে মাত্র ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে শকুনের কিডনি বিকল (রেনাল ফেইলিওর) হয়ে পড়ে এবং তারা মারা যায়। শকুনের ওপর এই মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কারণে ডাইক্লোফেনাক ওষুধটি ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও ২০১০ সাল থেকে গবাদিপশুর চিকিৎসায় এটি নিষিদ্ধ হলেও মাঠপর্যায়ে এর চোরগোপ্তা বিক্রি ও যথেচ্ছ ব্যবহার এখনও থামেনি।
২. শতবর্ষী ও উঁচু গাছের তীব্র সংকট: অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক এবং সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার (এসডব্লিউএএন)-এর সভাপতি আদনান আজাদ (ফয়সাল বিন আজাদ) বলেন, “শকুন কখনও কোনও ছোট বা মাঝারি গাছে বসে না বা বাসা বাঁধে না। কমপক্ষে দেড়-দুইশত বছরের পুরোনো এবং বিশাল আকৃতির শতবর্ষী গাছ ছাড়া শকুন বিচরণ করে না। এরা সাধারণত রেইনট্রি, কড়ই, শিমুল, শেওড়া ও তালগাছে বাস করে। কিন্তু মানুষের কাঠের চাহিদা মেটাতে দেশে গত কয়েক দশকে এমন প্রাচীন ও শতবর্ষী গাছ ব্যাপক হারে কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে শকুনের নিরাপদ বাসস্থান ও প্রজননের জায়গা বাংলাদেশ থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে।”
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক মৃত্যু
বন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য মতে, ২০০৮ সালেও দেশে ১ হাজার ৯৭২টি শকুন টিকে ছিল। তবে ২০১৫ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২৬০টিতে। বর্তমানে এই ২৬০টি বাংলা শকুনের মধ্যে সিলেট অঞ্চলে ১০০টির মতো অবশিষ্ট আছে, যার মধ্যে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা জাতীয় উদ্যান ও তৎসংলগ্ন এলাকায় আছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি।
সংখ্যার দিক থেকে শকুন যখন শূন্যের কোঠায়, তখন সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সিলেটে একের পর এক শকুনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
২০২৩ সালের ২৩ মার্চ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কালারবাজারে একটি মৃত গরুর মাংস খেয়ে একসঙ্গে ১৪টি শকুন মারা যায়। আইইউসিএনের গবেষক দল প্রাথমিকভাবে জানায়, লোকালয়ে কুকুর-শিয়াল মারার জন্য বিষাক্ত মাংস রাখা হয়েছিল অথবা ওই মৃত গরুর শরীরে নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেনাক বা কেটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ পুশ করা হয়েছিল, যা খেয়ে শকুনের পুরো দলটির মৃত্যু হয়।
২০২১ সালের ২০ ও ২১ জুলাই মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলার আটঘর এলাকায় একইভাবে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আরও একঝাঁক শকুন মারা যায়।
২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে মৌলভীবাজারের সিন্দুরখান এলাকার জাম্বুরাছড়া থেকে একটি অসুস্থ বাংলা শকুন উদ্ধার করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা, যা পরে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ধীরগতির প্রজনন ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুনের প্রজনন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। এরা সাধারণত দুই বছরে মাত্র একবার একটিমাত্র ডিম পাড়ে। কোনও কারণে সেই ডিমটি নষ্ট বা পাচার হয়ে গেলে ওই জোড়া থেকে প্রজাতির সংখ্যা বাড়ার আর কোনও সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, “শকুন রক্ষায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই। সরকার শকুন সংরক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি নিরাপদ অঞ্চল বা ‘ভলচার সেফ জোন’ ঘোষণা করেছে— একটি রেমা-কালেঙ্গা বন এবং অন্যটি সুন্দরবন এলাকা। এটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেনাকের অবৈধ বিক্রি ও যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ না হওয়ায় শকুনের সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, “প্রকৃতির এই পরম বন্ধুটি আমাদের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিষাক্ত ওষুধে চিকিৎসা করা গবাদিপশুর মরদেহ খোলা স্থানে ফেলা বন্ধ করতে না পারলে এদের বাঁচানো অসম্ভব।”
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
মহাবিপন্ন এই পাখিকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। এই জন্য প্রাকৃতিক জলাভূমি রক্ষা, প্রাচীন ও উঁচু গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং সরকারি খাল-নালার পাশে দীর্ঘমেয়াদি উঁচু গাছের চারা রোপণ করা জরুরি। আদনান আজাদ পরামর্শ দিয়ে বলেন, “এখনই প্রাণিসম্পদ অধিদফতর এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে জরুরি বৈঠক করতে হবে। যে বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক ও নিষিদ্ধ ব্যথানাশকের কারণে শকুনের কিডনি নষ্ট হচ্ছে, সেগুলোর উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও আমদানি সম্পূর্ণ সীলগালা বা বন্ধ করে দিতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে একটি শকুনও বাংলাদেশে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।”
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, “শকুন নিয়ে বলতে গেলে সারাদিনে শেষ করা যাবে না। একদিন আসেন, বসে আলোচনা করবো, আজ ব্যস্ত।” তবে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, চা বাগানসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকার পুরনো উঁচু গাছ কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ক্ষতিকর পশুখাদ্য নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই উপকারী শকুনের সংখ্যা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স